বৃষ্টি এসেছে জীবনে


একজন মানুষ এতক্ষণ বাথরুমে কি করে ? একুশ মিনিট অতিবাহিত অথচ বেরুনোর নাম পর্যন্ত নেই ! দোলনের এদিকে হয় হয় অবস্থা । পা টেনে টেনে হাঁটছে আর বারবার বাথরুমের দরজায় উঁকি দিচ্ছে । এই শীতের মধ্যেও সে ঘামতে শুরু করেছে । মাঝে-মাঝে যখন হটাৎ করে বেগ বেড়ে যাচ্ছে, তখন ওর চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে । একবার ভাবে পাশের ফ্লাটে যাবে কিনা । কিন্তু না, সেটা অসম্ভব ! পাশের ফ্লাটের কলেজ পড়ুয়া মেয়াটির সাথে সবেমাত্র অল্প অল্প জমে উঠেছে । ইদানিং তার প্রতি বেশ দূর্বলতাও অনুভব করছে দোলন । এমন সময় বাথরুমের কথা বলা ! সম্ভব নয়, তাতে যদি জামা-কাপড়েও হয়ে যায়, তবুও নয় । চাপ ক্রমেই বাড়ছে । আগ্নেয়গিরিতে ফাঁটল ধরার মতো আবস্থা, যেকোন সময় বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে । দোলনের পক্ষে আর ধৈর্য্য ধারণ করা কোন মতেই সম্ভব হচ্ছে না । অথচ কাজের বুয়া সেই যে বাথরুমে ঢুকেছে এখন পর্যন্তও বেরুনোর কোন লক্ষণ নেই । অবশেষে মান রক্ষার জন্য পাশের ফ্লাটে যাওয়ার আত্নঘাতী সিদ্ধান্তই নিল সে ।
পাশের ফ্লাটের এক মিনিটের পথ এই মুহূর্তে দোলনের কাছে এক ঘন্টার সমান মনে হচ্ছে । কলিং বেলে টিপ দিল । বৃষ্টিই দরজা খুলল । বলল, কি ব্যাপার দোলন ভাই ? বৃষ্টির প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো পরিস্থিতি এখন দোলনের নেই, ‘একটু বাথরুমে যাব’ বলেই ভিতরে ঢুকে গেল ।
ত্যাগের শান্তি শেষ হবার আগেই আরেক বিপদ আবিষ্কার করল দোলন । বাথরুমে পানি নেই । এতক্ষণে খেয়াল হলো, গতরাত থেকেই সাপ্লাই পানি বন্ধ । এখন উপায় ! আবার টেনশন শুরু হলো । দোলন ভাবতে লাগলো, ভালোবাসাতো আগেই শেষ, এবার বুঝি মান-সম্নানটাও যায় ! এরকম হাজারটা চিন্তা করতে করতে ঝিমুনি ধরে এসেছিল তার । হটাৎ বাথরুমের দরজার ওপাশ থেকে টক্‌টক্‌ শব্দ । ঘোর কেটে গেল দোলনের । দেখল, বাথরুমের দরজার নিচ দিয়ে একটুকরো কাগজ উঁকি দিচ্ছে । এই বিপদের মধ্যেও মনে হচ্ছে এটা যেন প্রেমপত্র হয় । জীবনে কখনো প্রেমপত্র পায়নি সে । কাগজের টুকরোটা তুলে নিয়ে পড়া শুরু করল-

প্রিয় বাথরুমবাসী,
আব্বু-আম্মু আফিসে এবং সেইসাথে কাজের বুয়ার স্ট্রাইক । বাড়িতে আমি একা । তারপরেও আপনার সমস্যার কথা চিন্তা করে অনেক কষ্টে হাফ বালতি পানি সংগ্রহ করেছি এবং তা দরজার নিকটে রেখে গেলাম । উহা দিয়ে আপনি নিজে উদ্ধার হোন এবং সেই সাথে আমাকেও উদ্ধার করুন ।
ইতি-
বাড়ি কতৃপক্ষ
( ভারপ্রাপ্ত )

চিঠি পড়া শেষ । এ যাত্রায় বিপদ থেকে রক্ষা পেল দোলন । কিন্তু এরকম একটা ঘটনার পর সে বৃষ্টির সামনে মুখ দেখাবে কিভাবে ? তাহলে দোলনের প্রথম ভালোলাগা কি ভালোবাসায় রুপান্তরিত হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে ? দু’সপ্তাহ হয়ে গেল কিন্তু বৃষ্টির সাথে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে একটি কথাও বলতে পারলো না । কেমন একটা লজ্জা ও সংকোচ কাজ করছে তার মধ্যে । এইতো কিছুক্ষণ আগেও পাশের রুমে বসে ভাবির সাথে অনেকক্ষণ গল্প করল বৃষ্টি, কিন্তু দোলনের সাথে কোন কথা হলোনা । এই মেয়েটাকে ছয় মাস ধরে দেখছে তারপরও তাকে একটুও বুঝতে পারছে না সে ।

কলেজে অনুষ্ঠান সেজন্য আজ শাড়ি পরেছে বৃষ্টি । বৃষ্টি এমনিতেই খুব সুন্দর, তার উপর শাড়িতে আরো বেশী সুন্দর লাগে ওকে । পরিচিতরা কমবেশী সবাই ওর রুপের প্রশংসা করে, কিন্তু দোলন ছেলেটাকে কেমন যেন অহংকারী মনে হয় বৃষ্টির, আজ পর্যন্ত একদিনও সে প্রশংসা করেনি, একবারের জন্যও সে সুন্দর বলেনি । তারপরেও বেরুনোর আগে পাশের ফ্লাটের ভাবির সাথে একবার দেখা করতে গেল । মনে মনে ভাবলো, দোলন ভাই যদি দেখে তাহলে বুঝবে, তাকে আজ কত সুন্দর দেখাচ্ছে ! কিন্তু দোলনকে কোথাও দেখতে না পেয়ে মনটা বিষন্ন হয়ে গেল ওর ।

বাসা থেকে বের হয়ে সিএনজি’র জন্য অপেক্ষা করছে । ট্রাফিক জ্যামের কারণে কোন সিএনজি চালকই সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে যেতে রাজি হচ্ছে না । এমন সময় পরিচিত কন্ঠস্বরে পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেল দোলন ভাই দড়িয়ে !
দোলন বলল, কোথায় যাবে ? কলেজে ?
বৃষ্টি মাথা নিচু করে ‘হু’ বলল ।
- দাঁড়াও, আমি ব্যবস্থা করছি ।
দোলন একটা সিএনজি ঠিক করল এবং বৃষ্টিকে উঠতে বলল । বৃষ্টি উঠা মাত্রই দোলনও বৃষ্টির পাশে উঠে বসলো । ঘটনার আকস্মিকতায় বৃষ্টি হটাৎ ঘাবড়ে গেল । বলল-
আপনি উঠলেন কেন ?
- তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা বলল ।
দোলন সিএনজিওয়ালাকে চালাতে নির্দেশ দিল । বৃষ্টি ভয় পেয়ে একপাশে গুটিশুটি হয়ে বসলো । দোলন বলল-
- আমি কি বাঘ ? আমাকে ভয় পাচ্ছ কেন ?
- মানুষ বাঘের চেয়েও খারাপ হতে পারে ।
- তারপরেও বেঁচে থাকার জন্য সেই মানুষকেই বিশ্বাস করতে হয় ।
- প্লিজ, কি বলতে চান, বলে, তাড়াতাড়ি নেমে যান ।
দোলন সরাসরি বৃষ্টির চোখের দিকে তাকালো । বলল, তোমাকে আমার ভালোলাগে । খুব,খুব বেশী । বৃষ্টি আমি তোমাকে……।
- থাক, আর বলার দরকার নেই । আমার পক্ষে সম্ভব না । আমি বাবা-মা’র অবাধ্য হতে চাইনা ।
- এক্ষুণি কিছু বলতে হবেনা । ভেবে দেখ । আমি অপেক্ষায় থাকবো ।
মাঝপথে সিএনজিকে দাঁড় করাল দোলন । তারপর ঝট্‌ করে নেমে পড়ল । চলে যাবার মুহূর্তে আরেকবার ঘুরে দাঁড়াল। বৃষ্টির দিকে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে বিষন্ন মনে আস্তে আস্তে বলল, তোমাকে আজ বড্ড বেশী সুন্দর লাগছে । আমি কখন যে নিজেকে তোমার মাঝে হায়িয়ে ফেলেছি, বুঝতে পারিনি ।
আজ ভ্যালেন্টাইন ডে । দোলনের মনটা একদম ভালো নেই । দু’মাস হয়ে গেল, কিন্তু বৃষ্টি এখনও পর্যন্ত তাকে কিছুই বলেনি । হয়ত বলবেও না । সে এখনো আগের মতোই দীর্ঘক্ষণ ধরে ভাবির সাথে গল্প করে, আড্ডা দেয়, কিন্তু দোলনের সাথে কোন কথা বলেনা । মাঝে-মধ্যে দূর থেকে একটু করে তাকায় আর সামান্য মুচকি হাসি দিয়ে চলে যায় ।
আজও সে সকাল থেকে ভাবির সাথে বসে গল্প করছে ।
দোলন আশা ছেড়ে দিয়ে, মন খারাপ করে একাএকা রুমে বসেছিল । হটাৎ ধূমকেতুর মতো বৃষ্টি এসে ঢুকলো । একটা কাগজ এগিয়ে ধরে বলল, এই ন্যান, ভ্যালেন্টাইনস্‌ ধাঁধাঁ ! পাঁচ মিনিটের মধ্যে উত্তর দেবেন ।
কাগজের উপর চোখ রাখল দোলন-
‘12-15-22-7
25-15-21’
মাত্র পাঁচ সেকেন্ডেই উত্তর পেয়ে গেল এবং আনন্দে লাফিয়ে উঠলো । বৃষ্টি মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল । বলল, কি, উত্তর পেয়ে গেছেন ?
- চোখ বন্ধ কর, বলছি ।
বৃষ্টি চোখ বন্ধ করলে, দোলন দু’হাতে ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলো । ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, উত্তর হলো- LOVE YOU.


ব্লগ থেকে সংগৃহীত।
These icons link to social bookmarking sites where readers can share and discover new web pages.
  • Digg
  • Sphinn
  • del.icio.us
  • Facebook
  • Mixx
  • Google
  • Furl
  • Reddit
  • Spurl
  • StumbleUpon
  • Technorati

Leave a comment

Admaya