নাটক
প্রদীপ শিখা
রচনা- মোঃ জাকির হোসেন
রচয়িতার কথা
ইভ টিজিং, মাদকতা,নারী নির্যাতন,শিশু নির্যাতন কোন সম-সাময়িক ঘটনা না। এ সমাজে বহু পূর্ব থেকেই এগুলি চলে আসছে। সামজিক প্রতিরোধে কখনও থমকে দাড়ায়, আবার কখনও চলতে থাকে। “প্রদীপ শিখা” নাটকটি সম-সাময়িক ঘটনার উপর নির্মিত। নাটকটি দেখে সমাজে ইভ টিজিং, মাদকতা,নারী নির্যাতন,শিশু নির্যাতন এর বিপরীতে যদি সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের মধ্যে সামান্যতম চেতনার প্রদীপ জ্বলে তাতেই সার্থকতা বোধ করবো-
মোঃ জাকির হোসেন
পার্বতীপুর,দিনাজপুর।
তাং-০৪.১২.২০১০ ইং
চরিত্র ক্রমানুসারে
চরিত্র :-
ডিজে :- ২২/২৫ মাস্তান টাইপ ধনীর ছেলে
চান :- ২০/২২ উপরের জনের সাঙ্গ
মনু :- অনুরূপ
ফালু :- ২০-২৫ গরীব ডিজের সঙ্গী
১ম ও ২য় মেয়ে :- স্কুল পড়ুয়া
রুনা :- গরীবের মেয়ে স্কুলে পড়ে
জুলহাস :- নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কলেজ পড়-য়া
শিক্ষক :- স্কুলের প্রধান শিক্ষক
চেয়ারম্যান :- ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান
ইমাম :- মসজিদের ইমাম
রফিক :- জুলহাসের সঙ্গী
ম্যাজিষ্ট্রেট :- ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক
সাব- ইন্সপেক্টর :- তরুন বয়স
পুলিশ :- মধ্য বয়স
৩ জন ছাত্র/ছাত্রী :- স্কুলগামী
২ জন অভিভাবক :- মধ্য বয়স
ইকবাল :- দেলোয়ারের বাবা বয়স ৫০
(১ম দৃশ্য)
(রাস্তার ধারে বেশ কিছু মাস্তান টাইপের ছেলেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে, কেউ সিগারেট টানছে, কেউ হিন্দী গানের তালে তালে নাচছে। এদের মধ্যে বেশ চাকচিক্যময় পোশাক পরিহিত ছেলে ওদের নেতা হিসাবে মনে হচ্ছে।)
মনু :- চুড়াকে দিল ম্যারা গোরিয়া চালি..........(গান বলতে থাকে অন্যরা মনুর সাথে তাল দিতে থাকে)
চান :- এই এই থাম থাম ব্যাটারা আজ কার পালা।
ফালূ :- কেন ডিজের।
ডিজে :- কেন সেই দিনই না তোদের খাওয়ালাম।
সবাই :- কোন দিন দোস্ত, ভুলে গেছি।
ডিজে :- ব্যাটারা ভুলে যাও। যে দিন নতুন মোটর সাইকেলটা আনলাম, সেই দিন।
মনু :- হ্যাঁ দোস্ত তোর বাপের মত বাপ যদি আমার থাকতো।
ডিজে :- তাহলে কি করতি?
মনু :- তাহলে ডেলি তোদের আমিই খাওয়াতাম।
চান :- তুই ব্যাটা ফকিরনীর পোলা, অত স্বপন দেখতে নাই। ডিজের বাপ ডিজে যখন যা চায়, তাই দেয়। কি দোস্ত ঠিক না?
ডিজে :- (হাসি দেয়) আরে দোস্ত, আমি কোন কিছু চাওয়ার পর যদি না পাই, বাপের এক ব্যাটা আমি এক বেলা খাওয়া বন্ধ করে দেই তাতেই কাম হাসিল। কেন ডিসকভার গাড়িটাতো ওভাবেই নিলাম। ডেলি পকেট খরচের কড়কড়ে টাকা না দিলে মায়ের কাছে নালিশ, আরে বাপকা মাল দরিয়ামে ঢাল।
ফালু :- তুই বাপের যত টাকা নষ্ট করছিস।
ডিজে :- ওই ভুতের মুখে রাম নাম। এক দিনওতো কাউকে খাওয়াতে পারলিনা। আমার টাকায় চলিস আবার উল্টা পাল্টা বলিস। তোর বাপ এইজন্য তোর নাম ফালু রেখেছে। আমরা খেয়ে দেয়ে তলানিতে যা থাকবে তাই তুই খাবি। আমার বাপের টাকা আমার যা খুশি তাই করবো তাতে তোর বাপের কি? একদিন পেটে ডাইলের পানি না পড়লে পায়ের কাছে পড়ে থাকিস। ফের যদি উল্টা পাল্টা বলিস থাপ্ড়াই কানটা লাল করে দিব। ধর ব্যাটা কানে ধরে দশ বার উঠ বস কর।
( ফালু ভয়ে কান ধরে উঠ বস করে অন্যরা হাসতে হাসতে গুনতে থাকে এক , দুই তিন.........এর মধ্যে স্কুল ড্রেস পরিহিত তিনটি মেয়ে স্কুলের পথে এক সঙ্গে আসে)।
মনু :- (১ম মেয়েকে) ও মেরি দিলকী রানী তুম কেইসে হো।
১ম মেয়ে :- সর কুত্তার বাচ্চা।( বেরিয়ে যায়)
চান :- (২য় মেয়েকে) আরে আরে থাম যাস কই? আমার ভাঙ্গা মনে আগুন জ্বালাইয়া কই যাস। তোরে আমি স্বপনের মহলে রানী বানাইয়া রাখবো।
২য় মেয়ে :- তোর বাপকে বলে দেব কিন্তু। (বেরিয়ে যায়)
ডিজে :- (৩য় মেয়েকে) রুনা কেমন আছো?
রুনা :- জ্বি ভাইয়া ভাল।
ডিজে :- ও রুনা ও, কতবার বলেছি আমাকে ভাইয়া বলবেনা। একটু অন্য নামে ডাকতে পারোনা।
রুনা :- ভাইয়া আমার ক্লাস আছে, আমাকে যেতে দাও।
ডিজে :- তা তো যাবেই। আমিতো তোমাকে আগেই বলেছি, তোমার গরীব বাবা তোমার সখ আলহাদ পূরন করতে পারেনা,আমার কথা শুনলে আমাকে একটু খুশি করতে পারলেই তোমাকে আমি টাকা দিয়ে ভাসিয়ে দিব, তোমার সারা অঙ্গে পড়িয়ে দিব টাকার অলংকার।
রুনা :- আপনার দোহাই লাগে, আমাকে যেতে দিন নাহলে স্যার আমাকে ক্লাসে ঢুকতে দিবেনা।
ডিজে :- ও-হ-হ আচ্ছা আচ্ছা যাও। তবে ভেবে দেখো আমার কথা।
(রুনা বেরিয়ে যায়, নিরীহ গোছের কলেজ পড়ুয়া ছাত্র জুলহাসের প্রবেশ)
ডিজে :- কি হে বাবা বিদ্যাসাগর, কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
জুলহাস :- আমাকে বলছেন?
ডিজে :- হ্যাঁ সোনার চান পিতলা ঘুঘু তোকেই বলছি।
জুলহাস :- আপনি আমার সাথে এভাবে কথা বলছেন কেন?
ডিজে :- (ধাক্কিয়ে) কিভাবে বলবো। আদর করে ললিপপ দিয়ে কাতুকুতু করে বলতে হবে নাকি?
জুলহাস :- দেখেন দেলোয়ার ভাই আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
চান :- এই ব্যাটা চুপ। কাকে দেলোয়ার বলছিস। জানিস না উনি আমাদের সকলের ডিজে ভাই।
মনু :- চোখের চশমাটা দেখনা যেন হ্যারি পটার।
ফালু :- না-না- শাহরুখ খান।
ডিজে এই চুপ তোরা। তা বাবা মিঃ হ্যারি পটার তোমাকে একটা কথা বলে দেই। তুমি যার সাথে খুশি যা করো কোন আপত্তি নাই। রুনার সাথে কোন ইটিশ পিটিশ করলে খবর করে দিব।
জুলহাস :- দেলোয়ার ভাই আপনি ভুল করছেন। রুনা আমার ছাত্রী। এসব কি আজে বাজে বলছেন।
ডিজে :- চুপ শালা। ছাত্রী........ ডাগর মগর চেহারা দেখে মজে গেছ তাই না?(ধাক্কা দিয়ে) আর দেলোয়ার কি ওরা কি বলে ডাকে আমাকে শুনলিনা। একটা থাপ্পড়ে পেচ্ছাব করিয়ে ছাড়বো।
জুলহাস :- দেখেন আপনি অযথা আমাকে গালি-গালাজ করছেন, ভুল করছেন।
ডিজে :- চুপ শালা।
জুলহাস :- আপনারা রাস্তায় দাড়িয়ে ছেলে মেয়েদের উত্যক্ত করছেন এটা ভাল হচ্ছে না।
ডিজে :- কি ভাল হচ্ছে না। তোর কোন বাপে আমাদের কি করবে রে। আরে বাবা সতিপনা ছাড়ো। এই ফালু তোর কাছে ডাইলের বোতলটা আছেনা, শালাকে দে তো এক ঢোক গিলিয়ে।
জুলহাস :- আপনারা প্রকাশ্যে দিবালোকে নেশা করেন এটা মোটেও উচিৎ না।
চান :- উচিৎ না- উচিৎ না- চুপ ব্যাটা একদম চুপ। কথা বলবি না।
মনু :- বেটা নেতা হয়ে গেছিস নাকি?
ফালু :- ব্যাটা হাফ প্যান্ট পড়িয়ে ছেড়ে দেব।
ডিজে :- যা ব্যাটা পালা আজকের মত ছেড়ে দিলাম। যা যা বললাম না করলে খবর আছে।
( চান,মনু, ফালু জুলহাসকে বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গিতে ইয়ার্কি করতে করতে ধাক্কা দিতে দিতে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেয়)
ডিজে :- এই শালার দিকে নজর রাখিস। এই মাল গুলা কোথায় চল ওই কোনাটায় যেয়ে টানা যাক, শালা নেশাটায় ফিকে করে দিল। (রুনা আমার রুনা তু মেরি জিন্দেগী বান গেয়ি গান গাইতে গাইতে সকলের প্রস্থান)
(২য় দৃশ্য)
(পড়ন্ত বিকেল, গ্রামের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, চেয়ারম্যান ও ইমাম সাহেব নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মত্ত)
শিক্ষক :- না চেয়ারম্যান সাহেব সমাজের মধ্যে নারীদের উপর যে ভাবে নির্যাতন বেড়ে গেছে, তাতে আর কতগুলো বিচার সালিশ করে পরিত্রান পাবেন?
চেয়ারম্যান :- ঠিকই বলেছেন। আসলে এর থেকে মুক্তি পাবার পথ সমাজের ভিতরে বাস করা উন্নত মন মানসিকতার জনতার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।
ইমাম :- সে তো আছেই। যে ভাবে শিশূ নির্যাতন, নারী নির্যাতন, মাদক সেবন ও অপ-সংস্কৃতি বেড়ে চলেছে তাতে কোমলমতি নতুন প্রজন্মকে সঠিক রাস্তায় রাখাই মুসকিল।
শিক্ষক :- হ্যাঁ পত্রিকার পাতা খুললেই, এ সমস্ত খবর মনটা খারাপ করে দেয়। এই দেখেন সম-সাময়িক ঘটনা গুলি ইভ টিজিং এর কারণে নারীরা আত্নহনন সহ কর্ম বিমূখতায় পড়ছে।
চেয়ারম্যান :- সেই জন্য তো সরকার আইন করে কঠিণতম বিচারের ব্যাবস্থা করছে।
ইমাম :- তবুও তো কমছেনা।
শিক্ষক :- হ্যাঁ। দেখেন এর থেকে মুক্তি পেতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এগিয়ে আসার দরকার।
চেয়ারম্যান :- কেন পত্রিকার খবর পড়েননি, কিছু দিন আগে এক শিক্ষক ইভ টিজিং এর প্রতিবাদ করায়, তাকে জীবন দিতে হলো।
শিক্ষক :- হ্যাঁ সে সাহসী শিক্ষক ছিল, আবার এমনও খবর আমাকে লজ্জা দিচ্ছে যে, শিক্ষক ছাত্রীকে উত্যক্ত করে কারাদণ্ড ভোগ করছে।
ইমাম :- আমাদের দূর্ভাগ্য আমাদের আশে পাশে নজর দিয়ে দেখেন অর্থ লোভীরা মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে মহিলাদের দিয়ে। তাদেরকে সহায়তা করছে আমাদের মত কিছু মানুষ।
চেয়ারম্যান :- মাদকাসক্তিই সমাজের তরুণদের বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। মাদক সেবনের টাকার জন্য মাকে হত্যা করছে, হত্যা করছে বাবাকে। নিজের রক্ত বিক্রী করে মাদক গ্রহণ করছে, নিজের জীবনকে নিয়ে যাচ্ছে এক অসীম অন্ধকারে।
শিক্ষক :- হ্যাঁ অন্ধকার জীবন থেকে এদের মুক্তি দিতে হলে সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাস্ট্র কে দিতে হবে কঠোর আইনী ব্যবস্থা।
ইমাম :- শুধু আইনী ব্যাবস্থায় কাজ হবে না। আমার আপনার ঘর থেকে প্রতিটি ঘরের অভিভাবকদের সচেতন হয়ে সন্তানেরা যেন বিপথে না যায় তার দিকেও নজর রাখা দরকার।
চেয়ারম্যান :- স্যার, ইমাম সাহেব এ ব্যাপারে আমাদেরও কিছু করার আছে। অভিভাবক,তরুন প্রজন্মদের নিয়ে আমরা মাদকাসক্তি, ইভ টিজিং, নারী নির্যাতন সহ সমাজের সকল অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ করতে পারি।
একত্রে :- অবশ্যই পারি। (জুলহাসের প্রবেশ)
জুলহাস :- (সকলের উদ্দ্যেশে ছালাম দেয়)
সকলে :- ( ছালাম গ্রহণ করে )
শিক্ষক :- জুলহাস কেমন আছো?
জুলহাস :- জ্বি স্যার ভাল।
শিৰক :- পড়া শোনা কেমন চলছে?
জুলহাস :- জ্বি ভাল।
শিক্ষক :- তোমার বাবা কেমন আছেন? টিউশনি প্রাকটিস কেমন চলছে?
জুলহাস :- জ্বি স্যার ভাল আছেন। টিউশনি করাচ্ছি দু একটি, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, মোটামুটি চলছে। এখন একটু রুনাকে পড়াতে যাব।
শিক্ষক :- রুনা তো ব্রিলিয়ান্ট, দেখ যেন ভাল রেজাল্ট করতে পারে।
জুলহাস :- জ্বি, আমি তাহলে আসি স্যার (সকলকে ছালাম দিয়ে বেরিয়ে যায়। অপর দিকে ডিজে,চান মনু ও ফালুরা গান গাইতে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে নাচতে নাচতে মঞ্চের অপর দিক দিযে বেরিয়ে যায়।)
চেয়ারম্যান :- স্যার এ ছেলে গুলো কে?
ইমাম :- আর বলবেন না চেয়ারম্যান সাহেব, ধনীর দুলাল ইকবালের কু-পুত্র দেলোয়ার আর তার সাঙ্গ-পাঙ্গ।
শিক্ষক :- দেলোয়ার কিন্তু এরকম ছিল না , ক্লাশ ফাইভে ও এইটে বৃত্তি পেয়েছিল। খুব ভাল ষ্টুডেন্ট ছিল। কিন্ত এখন কেন যে এমন হলো ?
ইমাম :- সঙ্গ দোষ। শুনলাম ছেলেটি নেশা করে ও রাস্তা ঘাটে বেয়াদপি আচরণ করে বেড়ায়।
চেয়ারম্যান :- ওর বাবা এগুলি নিষেধ করে না।
ইমাম :- নিষেধ করবে কি। বাবার পকেট থেকে টাকা পেয়েই তো যা খুশি তাই করে বেড়াচ্ছে।
শিক্ষক :- অথচ জুলহাস তার লেখা পড়ার খরচ মেটানোর জন্য টিউশনি করে বেড়ায়। দেলোয়ার জুলহাসের চেয়ে এক শ্রেণী উপরে ছিল অথচ লেখা পড়া ছেড়ে দিয়ে রাস্তা ঘাটে মাস্তানি সহ বিভিন্ন অপকর্ম করে বেরাচ্ছে এসব কথা শুনা যাচ্ছে। জুলহাস ভাল রেজাল্ট করবে ও এলাকায় নাম করবে।
চেয়ারম্যান :- অর্থ থাকলেই সব পাওয়া যায় না। নিজের সন্তান যদি মানুষের মত মানুষ না হতে না পারে, একজন পিতার কাছে এর চেয়ে দূর্ভাগ্য আর কি হতে পারে?
ইমাম :- যা বলেছেন আর কি।
শিক্ষক :- চেয়ারম্যান সাহেব মাদক ব্যবসায়ীরা এ সমস্ত ধনীর সন্তানদের টার্গেট করে বিভিন্ন ভাবে তাদেরকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। আপনারা যারা জনপ্রতিনিধি, তারা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে এ সমস্ত অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানো যায়।
চেয়ারম্যান :- হ্যাঁ কিছু একটা করা দরকার। ইমাম সাহেব আপনিও মসজিদে মজলিশে মানুষকে বলতে পারেন।
ইমাম :- অবশ্যই।
শিক্ষক :- চলেন চেয়ারম্যান সাহেব প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আপনার তো আবার একটি মিটিং এ যেতে হবে।
চেয়ারম্যান :- হ্যাঁ চলেন আর এ ব্যাপারে আর এক দিন বসে একটা ভাল সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।
(সকলের প্রস্থান)
(রুনার কাঁদতে কাঁদতে প্রবেশ জুলহাস এগিয়ে যায়)
রুনা :- স্যার আমার বুঝি আর লেখাপড়া হবে না।
জুলহাস :- কেন তোমার বাবা কিছু বলেছে?
রুনা :- না স্যার, দেলোয়ার প্রতিদিন রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে আমাকে বিরক্ত করে, আর খারাপ কথা বলে। স্যার বলেন, এভাবে কি স্কুলে যাওয়া যায়?
জুলহাস :- না রুনা, একটা ছেলের কারণে তোমার জীবনের লক্ষ থেকে সরে আসতে পারোনা। তোমাকে লেখা পড়া চালিয়ে যেতেই হবে।
রুনা :- তাহলে আমি কি করবো ?
জুলহাস :- তোমাকে প্রতিবাদী হতে হবে। সমাজে নারী ও পুর্বষের সমান মর্যাদা বিদ্যমান। সরকার এ সমস্ত বখাটেদের উৎপাত বন্ধ করার জন্য আইন করেছে, তার আশ্রয় নিতে হবে।
রুনা :- স্যার আইন কি করে আমাকে রক্ষা করবে? দেলোয়ারের বাবার টাকার কাছে আইন কি তার সোজা পথে চলতে পারবে?
জুলহাস :- পারবে পারবে। তোমাকে ইভ টিজিং এর মামলা করতে হবে ওর বিরুদ্ধে। দেখ ওকে শায়েস্তা হতেই হবে।
রুনা :- আমি লেখাপড়া করতে না পারলে আত্নহত্যা করবো।
জুলহাস :- না রুনা না। আত্নহত্যা মহা পাপ, তুমি প্রতিবাদী হলেই দেখ ও আর সাহস পাবেনা। মামলাটি কিভাবে করতে হবে, আমি চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে জেনে এসে তোমার বাবা সহ থানায় যাব। তুমি মনে সাহস রাখো। যাও বাড়ীতে যাও। আমি চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে যাই। (উভয়ের প্রস্থান)
(৪র্থ দৃশ্য)
(চেয়ারম্যান বাড়ীর রাস্তার সামনে শিক্ষক, চেয়ারম্যান ও ইমাম দাড়িয়ে। জুলহাসের প্রবেশ)
জুলহাস :- (সবাইকে ছালাম দেয় ও সকলে ছালাম গ্রহণ করে)
শিক্ষক :- কি জুলহাস কেমন আছো?
জুলহাস :- জ্বি স্যার ভাল। আমি চেয়ারম্যান সাহেব ও আপনাদের কাছে একটু পরামর্শ নিতে এলাম।
চেয়ারম্যান :- বলো বাবা বলো।
জুলহাস :- এনামুল চাচার মেয়ে রুনাকে দেলোয়ার প্রতিদিন স্কুলের রাস্তায় উত্যক্ত করছে। রুনা আপসেট হয়ে লেখাপড়া বন্ধ সহ আত্নহত্যার চিন্থা করছে। আমি ওকে মনে সাহস দিয়ে রেখে এলাম।
শিক্ষক :- চেয়ারম্যান সাহেব আর সহ্য করা যায় না। এ অবস্থায় কি ইভ টিজিং এর মামলা করা যায় না।
চেয়ারম্যান :- অবশ্যই।
ইমাম :- হ্যাঁ এখুনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষক :- তুমি এনামুল সহ রুনাকে নিয়ে থানায় যাও।
চেয়ারম্যান :- আমরাও কিছুক্ষনের মধ্যে আসছি।
জুলহাস :- স্যার এর প্রতিবাদে কি, মানব বন্ধন, সংবাদ সম্মেলন করে প্রশাসনকে স্মারকলিপি দেয়া যায়?
শিক্ষক :- অবশ্যই করা যায়। তুমি প্রথমে থানায় যাও, আমরাও সকল ব্যাবস্থা নিয়ে আসছি।
(সকলের প্রস্থান)
(৫ম দৃশ্য)
( সারিবদ্ধ ভাবে চেয়ারম্যান, শিক্ষক, ইমাম, জুলহাস ও স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী সবাই দাড়িয়ে আছে। বুকে মাদক বিরোধী, ইভ টিজিং বিরোধী শ্লোগান সম্বলিত পোষ্টার নিয়ে বেশ কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে তারপর একে একে সবাই বেরিয়ে যায়।)
(৬ষ্ঠ দৃশ্য)
(জুলহাস ও রফিক মঞ্চে প্রবেশ করে, অপর দিক থেকে ডিজে, চান, মনু ও ফালু প্রবেশ করে)
ডিজে :- (জুলহাসের কলার ধরে) শালা শুয়োরের বাচ্চা। তোর জন্য আজ আমাকে পুলিশ খুজছে। বেটা ইভ টিজিং এর মামলা করাও। মানব বন্ধন করো। কিস্সু করতে পারবেনা আমার। কয়েকদিনের মধ্যে সব ঠান্ডা করে দিব। এই শালা ছোট লোকের বাচ্চা, টাকা চিনিস টাকা। টাকার কাছে সব পানি।
জুলহাস :- আপনার ধারনা ভুল। আমার মনে হয় ইদানীং টিভি নিউজ আর পেপার দেখেন না। সরকার ও সামাজিক সংগঠনগুলো আপনাদের মত লোকদের বিরুদ্ধে যেভাবে সামাজিক প্রতিরোধ ও আন্দোলন গড়ে তুলছে তাতে রক্ষা পাবেন না।
ফালু :- বস্ বেটা বেশী কথা বলছে।
চান :- সাইজ করি বস।
মনু :- বেশী ফাল পাড়িস কেন( জুলহাসকে ধাক্কা দেয়)
ডিজে :- চল শালা চল, আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। (টেনে নিয়ে যেতে থাকে জুলহাসকে, জুলহাসের সঙ্গে থাকা রফিক বাধা দিতে গেলে চান, মনু, ফালু ছেলেটাকে মারধোর করে মঞ্চে ফেলে, জুলহাসকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। রফিক উঠে ওদের পিছু নেয়।)
(৭ম দৃশ্য)
(জুলহাসের সঙ্গে থাকা রফিক উল্টো দিক দিয়ে প্রবেশ এবং অন্য দিক থেকে চেয়ারম্যান, শিক্ষক,ইমামের প্রবেশ)
রফিক :- (হাফাতে হাফাতে) স্যার স্যার......
শিক্ষক :- কি রফিক তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন ?
রফিক :- স্যার আমি আর জুলহাস ভাই এক সঙ্গে ছিলাম। রাস্তায় হঠাৎ করে দেলোয়ার জুলহাস ভাইকে টেনে হেচড়ে আম বাগানের দিকে নিয়ে গিয়ে পেটে ছুরি মেরে পালিয়ে যায়।
চেয়ারম্যান :- জুলহাস এখন কোথায়?
রফিক :- আমি চিৎকার করে লোকজন ডেকে ভ্যানে করে হাসপাতালে ভর্তি করে, আপনাদের খবর দিতে এলাম, অবস্থা বেশী ভাল না।
ইমাম :- আমাদের হাসপাতালে যাওয়া দরকার, সূচিকিৎসার খবর নেওয়া দরকার।
( এমন সময় একজন পুলিশ, সাব ইন্সপেক্টর, ম্যাজিষ্টেট সহ কোমরে দড়ি বাধা অবস্থায় দেলোয়ার,চান,মনু ও ফালুকে নিযে মঞ্চে প্রবেশ করে)
সাব ইন্সপেক্টর :- (চেয়ারম্যানকে ছালাম দেয়)
চেয়ারম্যান:- ( ছালাম গ্রহণ করে) কি ব্যাপার ইন্সপেক্টর সাহেব এদের কোথায় পেলেন। এরা নাকি জুলহাসকে ছুরি মেরেছে।
সাব ইন্সপেক্টর :- ইনি(ম্যাজিষ্টেট কে দেখিয়ে) ইভ টিজিং মামলার ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিষ্টেট। (সবাই ম্যাজিষ্টেট কে ছালাম দেয়) এদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ইভ টিজিং এর মামলায় অনেকদিন ধরে পুলিশ খুজছিল। আজ গ্রেফতার করা হলো।
ইমাম :-চোরের দশ দিন আর সাধুর একদিন।
সাব ইন্সপেক্টর :- ওরা জুলহাসকে ছুরি মেরে পালানোর সময় আমাদের সামনে পড়ে যায় এবং ধরা পড়ে।
ম্যাজিষ্টেট :-আমার পরিচয় তো জানলেনই। আমি এই মুহুর্তে এখানেই এই ইভ টিজিং মামলাটির ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক হিসেবে আপনাদের সামনে বিচার কার্য সম্পাদন করতে চাই।
চেয়ারম্যান :- অবশ্যই।
( এ সময় বেশ কিছু স্কুল ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবক গণ ঘটনা দেখার জন্য মঞ্চে প্রবেশ করে এবং সবার পিছনে এসে দাড়ায় দেলোয়ারের বাবা ইকবাল)
ম্যাজিষ্টেট :- আজকের এই ভ্রাম্যমান আদালত অভিযুক্ত দেলোয়ার ওরফে ডিজের বিরুদ্ধে ইভ টিজিং এর মামলায় মেয়েদের উত্যক্ত করার অভিযোগ সাক্ষ্য প্রমান দ্বারা প্রমানিত হওয়ায় তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হলো এবং জুলহাসকে হত্যা প্রচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে দেলোয়ার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সরকার কর্তৃক মামলা দায়ের সাপেক্ষে গ্রেফতার দেখানো হলো।
শিক্ষক :- আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ম্যাজিষ্টেট :- না না এ আমার কর্তব্য ছিল। আপনারা এলাকার বখাটেদের সাবধান করে দিন, দিন পাল্টেছে, কেউ অন্যায় করে পার পাবে না। ইন্সপেক্টর নিয়ে চলুন এদের।
সাব ইন্সপেক্টর :- ইয়েস স্যার। এই নিয়ে চলো।
(ম্যাজিঃ,এস আই,পুলিশ দেলোয়ার ও তার সহযোগীদের নিয়ে প্রস্থান করে)
চেয়ারম্যান :- যাক সমাজের অন্তত একটি কালো দাগ উঠলো। ( পিছন থেকে দেলোয়ারের বাবা ইকবাল সামনে এগিয়ে এসে)
ইকবালঃ- হ্যাঁ হ্যাঁ কালো দাগ। সাড়া জীবন টাকার পিছনে দৌড়িয়েছি। একমাত্র পুত্রের আবদার সেটা ভাল কি মন্দ কোন বাছ- বিচার না করে যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি, কখন কোথায় কি করছে কখনও খোঁজ নেইনি। এ ভুল বড় ভুল। এ ভুল যেন সমাজে আর কেউ না করে। দেলোয়ার আমার ছেলে এটা স্বীকার করে নিতে আমার এখন লজ্জা লাগছে। এ লজ্জা আমি কোথায় রাখি।
চেয়ারম্যান :- ইকবাল সাহেব শান্ত হোন। মনটাকে শক্ত করুন। হয়তো দেলোয়ার সাজা ভোগের পর নিজেকে সংশোধন করে ফেলবে।
ইকবাল :- না চেয়ারম্যান না। এ করুন পরিণতি দেখার আগেই আমার কেন মৃত্যু হলো না। না- না- না আমি কেন মৃত্যু কামনা করবো। সমাজে এই যে ছেলে মেয়েরা রয়েছে এরা এরাই আমার সন্তান। রুনার মত মেয়েদের নিরাপদ জীবনের ক্ষেত্র তৈরী করতে আপনাদের সাথে আমিও থাকতে চাই, আমাকে নেবেন না আপনাদের সঙ্গে।
চেয়ারম্যান :- অবশ্যই আপনিও আমাদের সাথে থাকবেন।
ইকবাল :- আমি সমাজের সকল বাবা- মার প্রতি আকুল আবেদন জানাবো, আমার এ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আপনারা প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন এখুনি,এখুনি প্রদীপ শিখা জ্বালাতে হবে, যাতে আর কোন সন্তান বিপথে যেতে না পারে।
শিক্ষক :- চলুন হাসপাতালে যাই। জুলহাসকে হয়তোবা উন্নত চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালে পাঠাতে হতে পারে।
চেয়ারম্যান :- হ্যাঁ চলুন।
ইকবাল :- হ্যাঁ চলুন। আমি ওর সকল চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করবো। আমাকে এ কাজটি করতে দিন আপনারা।
শিক্ষক :- ঠিক আছে ঠিক আছে চলুন। (সকলে একই দিকে প্রস্থান করবে। মঞ্চ অন্ধকার)
সমাপ্ত
( বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ- যদি কেহ নাটকটি কপি করে আপনার এলাকায় মঞ্চস্থ করতে চান, তবে অনুগ্রহ পূর্বক মূল রচয়িতার নামটা অবশ্যই দিবেন। অনুরোধ ক্রমে- রচয়িতা )